Home / Slideshow / সাদ্দাম সম্পর্কে মার্কিনিদের সব ধারণাই ভুল

সাদ্দাম সম্পর্কে মার্কিনিদের সব ধারণাই ভুল

ইরাকের সাবেক প্রেসিডেন্ট সাদ্দাম হোসেনের সরকারের হাতে গণবিধ্বংসী অস্ত্র (উইপনস অব মাস ডেস্ট্রাকশন, সংক্ষেপে ডব্লিউএমডি) অস্ত্র আছে এমন ধোয়া তুলে ২০০৩ সালে দেশটিতে হামলা চালায় যুক্তরাষ্ট্র। কিন্তু গণবিধ্বংসী অস্ত্র থেকে শুরু করে সাদ্দাম হোসেনের ব্যক্তিগত অনেক বিষয় নিয়ে মার্কিনিদের ধারণার সবই ছিল ভুল। মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থা সিআইএর এক কর্মকর্তা এই দাবি করেছেন।

সিআইএর কর্মকর্তা জন নিক্সন ইরাকে একজন বিশ্লেষক হিসেবে কাজ করেছেন। ইরাক অভিযান শুরুর কয়েক বছর পর সাদ্দাম হোসেন ধরা পড়লে এ কর্মকর্তাই তাঁর সাক্ষাৎকার নেন। এ সময়ই তিনি সাদ্দাম সম্পর্কে মার্কিনিদের জানা বিভিন্ন তথ্যের গরমিল দেখতে পান। চলতি মাসের ২৯ তারিখ প্রকাশিতব্য ‘ডিব্রিফিং দ্য প্রেসিডেন্ট : দি ইন্টারোগেশন অব সাদ্দাম হোসেন’ বইয়ে বিষয়গুলো তুলে ধরেছেন জন নিক্সন।

জন নিক্সন জানান, ২০০৩ সালের ১৩ ডিসেম্বর সিআইএর নির্বাহী পরিচালক বাজ কংগ্রাড তাঁকে ফোন করেন। তাঁকে জানানো হয়, সাদ্দামের নিজের এলাকা তিকরিতের এক বাগানের ভূগর্ভস্থ বাঙ্কার থেকে এক বৃদ্ধকে আটক করা হয়েছে। সে সাদ্দাম কি না নিশ্চিত হতে হবে।

দীর্ঘদিন ধরে সাদ্দাম সম্পর্কে পড়াশোনা করেছেন জন নিক্সন। তাই সাদ্দামের ডান হাতে থাকা আদিবাসী ট্যাটু এবং বাঁ পাঁয়ে থাকা গুলির দাগের কথা বলেন তিনি।

সিআইএর পক্ষ থেকে জন নিক্সনকে সশরীরে বাগদাদ বিমানবন্দরে গিয়ে ওই বৃদ্ধ সাদ্দাম কি না যাচাই করতে বলা হয়। জন নিক্সন সেখানে পৌঁছে শশ্রুমণ্ডিত এক বৃদ্ধকে দেখতে পান।

দোভাষীয়র মাধ্যমে বৃদ্ধের সঙ্গে কথা হয় জন নিক্সনের। তাঁকে প্রশ্ন করা হলে উল্টো তিনিই প্রশ্ন করে নিক্সনদের পরিচয় জানতে চান, তাঁরা সামরিক গোয়েন্দা নাকি বেসামরিক?

আদিবাসী ট্যাটু ও পায়ের দাগ দেখে জন নিক্সন নিশ্চিত হন, তাঁরা আসল সাদ্দাম হোসেনকেই খুঁজে পেয়েছেন। পরে সাদ্দামের কাছে জানতে চান, তিনি কীভাবে বাগদাদ থেকে পালিয়েছেন? কারা সাহায্য করেছে?

তবে সাদ্দাম নিজের ইচ্ছামতো প্রশ্নের উত্তর দিচ্ছিলেন। সাদ্দাম খেঁকিয়ে ওঠেন, ‘আমার কাছে রাজনীতি সম্পর্কে জানতে চাও? অনেক কিছুই জানতে পারবে।’

গণবিধ্বংসী অস্ত্র সম্পর্কে জানতে চাওয়া হলে ব্যঙ্গ করে সাদ্দাম হোসেন বলেন, ‘তোমরা এমন বিশ্বাসঘাতক খুঁজে পেয়েছ যে সাদ্দামের কাছে পৌঁছে দিয়েছে। সেখানে কি কোনো বিশ্বাসঘাতক নেই যে তোমাদের গণবিধ্বংসী অস্ত্রের কথা বলেছে?’

সাদ্দাম হোসেন বলেন, ‘ইরাক কোনো সন্ত্রাসী দেশ নয়। আমাদের সঙ্গে বিন লাদেনের কোনো সম্পর্ক নেই এবং এবং কোনো গণবিধ্বংসী অস্ত্রও ছিল না। আমরা কখনোই প্রতিবেশীদের জন্য হুমকি ছিলাম না। কিন্তু আমেরিকার প্রেসিডেন্ট (জর্জ ডব্লিউ বুশ) বলেছেন, ইরাক তাঁর বাবাকে আক্রমণ করতে চায় এবং আমাদের কাছে গণবিধ্বংসী অস্ত্র আছে।’

সৌদি আরবে মোতায়েনকৃত মার্কিন সেনাদের ওপর কখনো গণবিধ্বংসী অস্ত্র ব্যবহারের পরিকল্পনা ছিল কি না? জন নিক্সনের এমন প্রশ্নের জবাবে সাদ্দাম হোসেন বলেন, ‘আমরা কখনোই গণবিধ্বংসী অস্ত্র ব্যবহারের চিন্তা করিনি। এটি নিয়ে আলোচনা হয়নি। বিশ্বের বিরুদ্ধে রাসায়নিক অস্ত্র ব্যবহার? পূর্ণ মানসিক ভারসাম্যের কোনো মানুষ কি এমন করতে পারে? কে এমন অস্ত্র ব্যবহার করবে, যখন আমাদের ওপর এমন অস্ত্র ব্যবহার হয়নি।’

ইরাক-ইরান যুদ্ধে কুর্দি শহরে রাসায়নিক অস্ত্র ব্যবহারের কথা স্বীকার করলেও তাঁর নির্দেশে এমনটি ঘটেনি বলে দাবি করেন সাদ্দাম হোসেন।

প্রথম সাক্ষাতের পর বিভিন্ন সময়ে সাদ্দাম হোসেনের সঙ্গে কথা হয় জন নিক্সনের। এসব সাক্ষাতে সাদ্দামের বিভিন্ন ব্যক্তিগত বিষয় সম্পর্কেও জানেন তিনি। বিস্ময়ের সঙ্গেই নিক্সন দেখেন মার্কিনিদের ধারণার চেয়ে প্রকৃত সাদ্দাম হোসেন বেশ ভিন্ন।

সৎবাবা প্রসঙ্গ

শৈশবে তিকরিতের সৎবাবার হাতে পিটুনি খেয়েছেন সাদ্দাম হোসেন। অনেক মনস্তাত্ত্বিকের দাবি, এ কারণেই সাদ্দাম হোসেনের মধ্যে নিষ্ঠুরতা এবং পরমাণু অস্ত্র সংগ্রহের চেষ্টা দেখা যায়। এমন তথ্য ছিল সিআইএর কাছে।

তবে সাদ্দাম হোসেন বলেন, ‘তাঁর সৎবাবা ছিলেন অত্যন্ত ভালোমানুষ। আল্লাহ তাঁকে শান্তিতে রাখুক। কোনো গোপনীয় বিষয়েও সৎবাবা তাঁকে বিশ্বাস করতেন। এমনকি আপন ছেলে ইদহামের চেয়েও তাঁকে পছন্দ করতেন সৎবাবা।’

আবার অসুস্থতার কারণে সাদ্দাম হোসেন রেড মিট ও চুরুট খাওয়া ছেড়েছেন বলে তথ্য ছিল সিআইএর কাছে। তবে সাদ্দাম হোসেন বলেছেন, ‘তিনি রেড মিট খাওয়া ছাড়েননি। আর তিন-চারটা করে চুরুট এখনো খান।’

জন নিক্সন জানান, এমন খাদ্যাভ্যাস সত্ত্বেও বেশ সুস্বাস্থ্য ছিল সাদ্দামের।

যুক্তরাষ্ট্রের ৯/১১ হামলা সম্পর্কে সাদ্দাম হোসেন বলেন, ‘দেখেন কারা যুক্ত ছিল? কোন দেশ থেকে তাঁরা এসেছিল? সৌদি আরব। দলের নেতা মোহাম্মদ আতা কি ইরাকি ছিল? না, ছিল মিসরীয়। কেন মনে করেন, আমি এতে যুক্ত ছিলাম?’

জন নিক্সন বলেন, প্রকৃতপক্ষে ৯/১১ হামলার পর সাদ্দাম আশা করেছিল, ইরাক ও যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্ক আরো ভালো হবে। কারণ, মৌলবাদীদের সঙ্গে লড়তে তাঁর ধর্মনিরপেক্ষ সরকারের সহায়তা প্রয়োজন ছিল ওয়াশিংটনের। তবে তাঁর এ ধারণা ছিল ভুল।

ইতিহাসই বলে দিয়েছে সাদ্দাম সঠিক ছিল

সাক্ষাৎকারের সময় দূরে বিস্ফোরণের শব্দ শুনে সাদ্দাম হোসেন বলেন, ‘তোমরা ব্যর্থ হবে। তোমরা বুঝতে পারবে, ইরাক শাসন করা এত সহজ নয়।’

ইতিহাসই বলে দিয়েছে সাদ্দাম সঠিক ছিল। তবে ওই সময় সাদ্দামের এমন মন্তব্যের কারণ সম্পর্কে জানতে চান উৎসাহী জন নিক্সন।

সাদ্দাম হোসেন বলেন, ‘ভাষা, ইতিহাস ও আরব মানসিকতা তোমরা (মার্কিনিরা) জানো না। ইতিহাস আর জলবায়ু সম্পর্কে জ্ঞান ছাড়া ইরাকিদের জানা খুবই কঠিন। পার্থক্য দিন ও রাতে এবং শীত ও গ্রীষ্মের। এ জন্যই তারা বলে, গ্রীষ্মে ইরাকিদের মাথা গরম থাকে।’

সাদ্দাম হোসেন বলেছিলেন, ‘আগামী গ্রীষ্মে হয়তো তোমাদের বিরুদ্ধেই বিদ্রোহ করবে তাঁরা (ইরাকিরা)। ১৯৫৮ সালে প্রচণ্ড গরম পড়েছিল। আবার ১৯৬০ সালের গরমে আমরা বিপ্লব করেছিলাম। তুমি এটি হয়তো প্রেসিডেন্ট বুশকে বলতে পারো।’

সাদ্দামের ফাঁসির এক বছর পর হোয়াইট হাউসে ডাক পড়ে জন নিক্সনের। সেখানে সাদ্দাম সম্পর্কে জানতে চাইলে প্রেসিডেন্ট বুশকে জন নিক্সন তা-ই বলেছেন, যা তিনি শুনতে চান। কারণ, প্রকৃত সাদ্দাম হোসেনের কথা শুনে মোটেই খুশি হননি বুশ।

সাদ্দাম হোসেনকে নিষ্পাপ বলতে রাজি নন জন নিক্সন। সাদ্দাম ছিলেন স্বৈরশাসক, যাঁর শাসনামলে ছিল নৈরাজ্য ও রক্তপাত। তবে মার্কিন সেনাদের জীবন ও ইসলামিক স্টেটের উত্থানের কথা চিন্তা করলে বয়স্ক ও বিচ্ছিন্ন সাদ্দাম হোসেনের ক্ষমতায় থাকা বিষয়টি অন্য রকম দেখায়। এখানে বলা বাহুল্য ইরাক পুনর্গঠনে মার্কিনিদের ব্যয় হয়েছে ২ দশমিক ৫ ট্রিলিয়ন পাউন্ড।

About Editor

Check Also

144

ছেলের বিয়ের আসরেই পুত্রবধূর ঠোঁটে চুম্বন শ্বশুরের!

অতিথিদের সমাগমে তুমুল হইচই বিয়েবাড়ি জুড়ে। চারিদিকে তখন নব দম্পতির সাংসারিক সুখের মঙ্গলকামনায় রত সবাই। …

106

দায়িত্ব ত্যাগের আগে রাশিয়াকে শাস্তি দিতে চান ওবামা!

২০১৬-র মার্কিন প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে অবৈধ হস্তক্ষেপের জন্য রাশিয়ার বিরুদ্ধে কড়া ব্যবস্থা গ্রহণ করতে চলেছে ওবামা …

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *